চাপে পড়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতের প্রবৃদ্ধি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) শুক্রবার প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি উদ্ভুত জটিলতার কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) আগাম পণ্য আমদানির প্রবণতা ছিল বাড়তির দিকে। ফলে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতের সার্বিক প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিশ্বব্যাপী পণ্য ও সেবা আমদানি-রফতানির গতি কমে আসবে। বিশ্ববাণিজ্যে এ চাপ অব্যাহত থাকবে ২০২৬ সালেও।
ডব্লিউটিওর সর্বশেষ সংশোধিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে দশমিক ৯ শতাংশে। আর ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা আগের পূর্বাভাস ২ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে কম। মূলত নতুন মার্কিন শুল্কনীতিই এ সময়ে বিশ্ববাণিজ্যের গতিকে চাপে রাখবে বলে অভিমত ডব্লিউটিওর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের খরচ বাড়ছে। এতে দেশটির আমদানি একদিকে কমবে, অন্যদিকে অংশীদার দেশগুলোর রফতানিও কমবে।
সংস্থাটি বলছে, আগে চলতি বছরে বিশ্ববাণিজ্যে ২ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দেয়া হলেও এখন তা সংশোধন করে সামান্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আগাম পণ্য আমদানি বা ‘ফ্রন্ট লোডিং’। বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১১ শতাংশ। শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে দেশটির ব্যবসায়ীরা বড় আকারে পণ্য এনে মজুদ করেছেন। এতে সাময়িকভাবে বাণিজ্য খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে অতিরিক্ত মজুদ থাকায় বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আমদানির গতি কমে আসবে।
ডব্লিউটিও মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘নানা ধাক্কার মুখেও বৈশ্বিক বাণিজ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। কিন্তু শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও বাণিজ্যে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অন্যতম বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখবে এশিয়া। তবে ২০২৬ সালে মহাদেশটির অবদান কিছুটা কমে আসতে পারে। উত্তর আমেরিকার অবদান উভয় বছরই কম থাকবে। ইউরোপের অবদান ২০২৫ সালে সামান্য কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতের সর্বোচ্চ সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামনের দিনগুলোয় জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী হয়ে উঠতে পারে। শক্তিশালী আমদানির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি পণ্যটির দাম কমে গেলে জ্বালানি রফতানিনির্ভর দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দাম কমার ফলে দেশগুলোর রফতানি আয় কমবে। এতে দেশগুলোর আমদানির সক্ষমতাও কমে যাবে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
ডব্লিউটিওর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর উত্তর আমেরিকার আমদানি কমতে পারে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এপ্রিলের পূর্বাভাসে এ হার আরো বেশি ধরা হয়েছিল। তাই এবার কিছুটা কম হ্রাসের আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়ার রফতানি বাড়তে পারে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ইউরোপের ক্ষেত্রে রফতানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য বিরতিতে পৌঁছানো এবং মোটরযান খাতে শুল্ক ছাড় কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে দুই দেশের মধ্যে কিছু পণ্যের আদান-প্রদান বেড়ে যেতে পারে। তবে আগস্টের শুরুর দিকে কার্যকর হওয়া উচ্চ শুল্কের প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা দেবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমবে এবং এর অংশীদার দেশগুলোর রফতানিও কমবে। এসব কারণে ২০২৬ সালেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি শ্লথ থাকতে পারে।
ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এমন প্রতিশোধমূলক শুল্কের ধারাবাহিকতা এড়ানো গেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারত। এক দেশ অন্য দেশের শুল্কের জবাবে পাল্টা শুল্ক দিলে তা বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এ অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও সহযোগিতা জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘কেবল নতুন অবকাঠামো তৈরি বা আর্থিক সহায়তা দিলেই হবে না। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ বজায় রাখা। ব্যবসায়ীরা যেন আগাম পরিকল্পনা করতে পারেন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং বাজারের আচরণ অনুমান করতে পারেন, এটাই বাণিজ্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।’
ডব্লিউটিওর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে যেসব পণ্য আগাম আমদানি করা হয়েছে এবং বড় আকারে মজুদ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব অস্থায়ী। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এ প্রভাব উল্টো দিকে কাজ করবে। তখন আমদানির প্রবৃদ্ধি কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলে জ্বালানি রফতানিনির্ভর দেশগুলোর আয় কমবে। এতে তাদের আমদানির চাহিদাও কমে যাবে।
যদিও বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি এপ্রিলের তুলনায় এখন কিছুটা ভালো আছে, তবু ডব্লিউটিও মনে করছে উচ্চশুল্কের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে সময় লাগবে। সংস্থাটি শুল্ক নীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাণিজ্য বিনিয়োগ পরিবেশে স্থিতিশীলতা আনতে যৌথ অর্থায়ন, জাতীয় সহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছে।
ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘এখনো কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশ্ব বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।’